ইরান যুদ্ধের জেরে শিপিংয়ের বাড়তি খরচ চাপবে ভোক্তার ওপর —মায়ের্স্ক সিইও

ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মায়ের্স্কের প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট ক্লার্ক।

সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেনিশ এ শিপিং জায়ান্টের প্রধান জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়া বা কমার ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিতে একটি বিশেষ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফলে বর্ধিত খরচ শেষ পর্যন্ত গ্রাহক ও সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের এ সংঘাত শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। মাঝে দাম কিছুটা কমলেও তা এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি।

মায়ের্স্ক মূলত খেলনা, পোশাক ও ইলেকট্রনিকস পণ্য বিশ্বব্যাপী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদিকে ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পণ্য পরিবহন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ফরে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে তৈরি হয়েছে ব্যাপক সংকট। উল্লেখ্য, সংঘাতের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ প্রণালি দিয়ে আসত।

ইরান সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এ অবরোধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে জানান, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে দেশকে তার সব সম্পদ সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে হবে। অন্যদিকে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিশ্বের বড় বড় শিপিং লাইন লোহিত সাগর এড়িয়ে চলছে। ফলে মায়ের্স্কের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জাহাজ পাঠাতে হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকার ‘কেপ অব গুড হোপ’ হয়ে অনেক দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল পথে। ফলে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।

ভিনসেন্ট ক্লার্ক জানিয়েছেন, প্রতিটি সাধারণ ২০ ফুটের কনটেইনারের জন্য বর্তমানে প্রায় ২০০ ডলার অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ ফ্রেইট বা পণ্য পরিবহন খরচ ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। মায়ের্স্কের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এমএসসি ও হ্যাপাগ-লয়েডও চার্জ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ক্লার্কের মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মায়ের্স্কের ওপর গভীর প্রভাব পড়েছে। অনেক গ্রাহক সময়মতো পণ্য পাচ্ছেন না। এতে বিশেষ করে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল অঞ্চলগুলোর জন্য চরম সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খাবারগুলো যেন নষ্ট না হয়ে দ্রুত সুপারমার্কেটের তাকে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা।’

পণ্যের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে ক্লার্ক জানান, স্থলপথ ও ট্রাক ব্যবহার করে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সমুদ্রপথে যে পরিমাণ পণ্য নেয়া সম্ভব, তা স্থলপথে সম্ভব নয়। তাই গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যসামগ্রী পরিবহনের জন্য পেট্রোকেমিক্যালের মতো অনেক রফতানি পণ্যকে আপাতত তালিকায় পেছনে রাখতে হচ্ছে।

সংকট সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স নৌনিরাপত্তা বা পাহারার নেভাল এসকট প্রস্তাব দিলেও ক্লার্ক মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত সংকীর্ণ এবং ইরানি উপকূলের খুব কাছে হওয়ায় নৌবাহিনীর পক্ষে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ঢাল তৈরি করা কঠিন।

তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এ বাণিজ্যপথগুলো পুনরায় সচল করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা বা চুক্তি হওয়াই সবচেয়ে উত্তম পথ।

মায়ের্স্কের সিইও স্পষ্ট জানিয়েছেন, কর্মীদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তিনি জাহাজ পাঠাতে রাজি নন। লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান কুয়েনে প্লাস নাগেলের তথ্য অনুযায়ী, ৯ মার্চ পর্যন্ত ১৩২টি জাহাজ পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে ছিল। কিছু জাহাজ নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতে ট্র্যাকিং যন্ত্র বন্ধ রাখায় সঠিক সংখ্যা জানা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে দীর্ঘ দুই বছর বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল শুরু করলেও নতুন করে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা পুরো সাপ্লাই চেইনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ক্লার্কের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যের স্বার্থে নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা জরুরি।

আরও